টেস্টে প্রথম ২০ বছর শেষে কোন দল কেমন ছিল


  প্রকাশিত হয়েছেঃ  10:38 AM, 13 November 2020

ক্রিকেটের আদি ফরম্যাট টেস্ট। সাদা পোশাকের এই লড়াই এখনো বিশ্বের কোটি মানুষের প্রিয় খেলা। আজ (১০ নভেম্বর) ২২ গজের লড়াইয়ে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ফরম্যাটে পথচলার ২০ বছর পূরণ করেছে বাংলাদেশ। অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে ভালো করলেও ব্যাটিং ব্যর্থতায় ভারতের কাছে শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে হার মেনেছিল টাইগাররা।

সেই শুরুর পর এখন পর্যন্ত ১১৯টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। সাদা পোশাকে খেলা শুরুর ষষ্ঠ বছর ও ৩৫তম ম্যাচে এসে প্রথম জয়ের স্বাদ পেয়েছিল লাল সবুজের প্রতিনিধিরা। সব মিলিয়ে টাইগাররা জিতেছে ১৪ ম্যাচে। ১৬ ড্রয়ের বিপরীতে ৮৯টি হার অবশ্য একটু ভারী ঠেকতে পারে।
খেলা শুরুর পর প্রথম ২০ বছরে টেস্ট খেলুড়ে অন্যান্য দেশগুলোর অবস্থাও যে খুব ভালো ছিল তা নয়। অন্যান্য টেস্ট খেলুড়ে দেশের নিজেদের প্রথম ম্যাচের ফলাফল, প্রথম জয় ও শুরুর ২০ বছরের পরিসংখ্যানে চোখ বুলালেই সব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া মানেই এক সমীহ জাগানিয়া নাম। ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেছে এই দলই। ১৮৭৭ সালের ১৫ মার্চ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সেই ম্যাচে ৪৫ রানে জিতেছিল অজিরা।নিজেদের প্রথম ২০ বছরে ৪৭টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশের সমান ১৪ টেস্টে জয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ছয়টি ড্র, ২৬ হারের পাশাপাশি একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছিল।

ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড, এটা ক্রিকেটপ্রেমী সকলেই জানেন। অভিষেক ম্যাচেই হারের স্বাদ পেলেও প্রথম জয় পেতে বেশি দেরী করতে হয়নি তাদের। পরের ম্যাচ অর্থাৎ দ্বিতীয় ম্যাচেই অজিদের বিপক্ষে ৪ উইকেটের জয় পেয়েছিল ইংলিশরা।
প্রথম ২০ বছরে ৫৩ টেস্ট খেলে ২২টিতেই জিতেছিল ইংল্যান্ড। ছয়টি ড্রয়ের পাশাপাশি ১৪টি হারের সবকটিই ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। এছাড়া একটি ম্যাচ ছিল পরিত্যক্ত।

উপমহাদেশ তো বটেই, বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটেই সময়ের অন্যতম পরাক্রমশালী দল ভারত। অথচ নিজেদের প্রথম ২০ বছরে এই দল জিতেছিল মাত্র একটি টেস্ট ম্যাচ! ১৯৩২ সালের ২৫ জুন টেস্ট খেলা শুরু করা ভারত ২০ বছরের মাথায় (১৯৫২ সাল) আরাধ্য সেই জয়ের স্বাদ পেয়েছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।

অভিষেক টেস্টে ইংলিশদের কাছে ১৫৮ রানে হারলেও ২৫তম ম্যাচে নিজেদের প্রথম জয়টা বড় ব্যবধানেই পেয়েছিল ভারত (ইনিংস ও ৮ রান)। সব মিলিয়ে নিজেদের প্রথম দুই দশকে ২৭ ম্যাচ খেলে দলটি। একটি জয় ও ১২টি ড্রয়ের বিপরীতে হার ছিল ১৪টি।

ভারতের টেস্ট আঙিনায় পা রাখার বছর দুয়েক আগে অভিষেক হয় নিউজিল্যান্ডের। ১৯৩০ সালের ১০ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ৮ উইকেটে হেরেছিল কিউইরা। প্রথম ২০ বছরে একবারও জয়ের মুখ দেখেনি দলটি। এসময় ২০টি ম্যাচ খেলে ১৪টি ড্রয়ের পাশাপাশি ছয়টি ম্যাচে হার নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল তারা।

প্রথম জয়ের স্বাদ পেতে নিউজিল্যান্ডকে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ ২৬ বছর। নিজেদের ৪৫তম ম্যাচে ১৯৫৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৯০ রানে জিতেছিল ব্ল্যাকক্যাপসরা।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পাঁচ বছর পর (১৯৫২ সাল) প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট খেলে পাকিস্তান। ১৬ অক্টোবর নিজেদের অভিষেক ম্যাচে ভারতের কাছে ইনিংস ও ৭০ রানে পরাজিত হয়েছিল নবাগত দলটি। তবে পরের ম্যাচেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের ইনিংস ও ৪৩ রানে হারিয়ে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় তারা।টেস্ট আঙ্গিনায় পথচলার প্রথম দুই দশকে ৬২ ম্যাচ খেলে ১০বার জয় নিয়ে সাজঘরে ফেরে পাকিস্তান। ৩৪ ম্যাচে ড্র করার পাশাপাশি হেরেছিল ১৮ ম্যাচে।

অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছিল দক্ষিন আফ্রিকা। ১৯৮৯ সালের ১২ মার্চ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে ৮ উইকেটের হার নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল জ্যাক ক্যালিস-ফাফ ডু প্লেসিদের পূর্বসুরিরা।ইংল্যান্ডকে হারিয়েই প্রথম জয়ের স্বাদ পায় প্রোটিয়ারা। সাদা পোশাকে খেলা শুরুর ১৭ বছর পর ও ১২তম ম্যাচে এসে মাত্র ১ উইকেটে জয় পেয়েছিল তারা। প্রথম ২০ বছর শেষে ১৯ ম্যাচ খেলে চারটি জয়, তিনটি ড্র ও ১২ ম্যাচে হেরেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।

এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি শ্রীলংকার টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় ১৯৮২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য অনেক দলের মতো তাদেরও প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচটি ৭ উইকেটে হেরেছিল লংকানরা। চার বছরের মাথায় (১৯৮৫ সাল) ১৪তম ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে প্রথম জয়ের স্বাদ উপভোগ করে শ্রীলংকা। ম্যাচটি ১৪৯ রানে জিতেছিল তারা।

টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মাঝে প্রথম ২০ বছরে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেশ্রীলংকা। ১২৪ ম্যাচ খেলে ২৮টিতে জয়ের পাশাপাশি তারা ড্র করেছিল ৪৮টি ম্যাচ। এছাড়া ৪৫টি ম্যাচে হার নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল তারা, পরিত্যক্ত হয় তিনটি ম্যাচ।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের নাম শুনলে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আফসোসের সুরটাই বেজে ওঠে বেশি। একসময় বিশ্ব ক্রিকেটকে শাসন করতো তারা। অথচ সময়ের পরিক্রমায় এখন কালেভদ্রে সাফল্যের দেখা পায় তারা।১৯২৮ সালের ২৩ জুন ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট অভিষেক হয়। ইংল্যান্ডের কাছে ইনিংস ও ৫৮ রানে হেরে পথচলা শুরু করা দলটি ষষ্ঠ ম্যাচে পায় প্রথম সাফল্য। সেবার ব্রিটিশদেরই ২৮৯ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়েছিল তারা। প্রথম ২০ বছরে ২৬ ম্যাচ খেলে ছয়বার জয়ের দেখা পায় ক্যারিবিয়রা। আট ম্যাচ ড্রয়ের পাশাপাশি হার নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল ১২বার।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে পথচলার শুরুর দিকে প্রবল প্রতিপক্ষ ছিল জিম্বাবুয়ে। ১৯৯২ সালের ৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেটের কুলীন গোত্রে নাম লেখায় তারা। ইতিহাসের একমাত্র দল হিসেবে অভিষেক টেস্টে ড্র করার কৃতিত্ব প্রদর্শন করে জিম্বাবুয়ে, প্রতিপক্ষ ছিল ভারত।
নিজেদের ১১তম ম্যাচে প্রথম জয় পায় জিম্বাবুয়ে। সেবার পাকিস্তানকে ইনিংস ও ৬৫ রানে হারিয়েছিল তারা। টেস্ট ফরম্যাটে আগমনের প্রথম দুই দশকে ৬৪ ম্যাচ খেলে দলটি। এর মাঝে জয় পায় সাত ম্যাচে। বাকিগুলোর মাঝে ২৩টি ড্র, ৩৩টি হার ও একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়।

বছর কয়েক আগে একসঙ্গে টেস্ট স্ট্যাটাস পায় আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তান। আইরিশরা তিন ম্যাচ খেলে একবারও জয়ের দেখা পায়নি। তবে আফগানরা চার ম্যাচ খেলে এরই মধ্যে দুটি জয় তুলে নিয়েছে।
পৃথিবীর শতাধিক দেশে ক্রিকেট খেলা হলেও টেস্ট খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে মাত্র ১২টি দল। এর মাঝে আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তান একবারেই নতুন। বাকিদের প্রথম দুই দশকের পারফরম্যান্সের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশ যে খুব বেশি এগিয়েছে তা বলা যাবে না। আবার খুব যে বেশি পিছিয়ে, সেই কথা বলারও জো নেই।

তবে সময়ের হিসেবে জয়-পরাজয়ের অনুপাত একটু বেশিই দৃষ্টিকটু। বলা হয়ে থাকে কোনো দেশের ক্রিকেট কতটুকু এগিয়েছে তা বোঝা যায় সেই দলের টেস্ট পারফরম্যান্স দেখলে। শুরুর দিকে একদম যাচ্ছেতাই খেললেও গত কয়েক বছরে মাঝে মাঝেই আশার আলো দেখিয়েছে টাইগাররা। জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলংকার বিপক্ষে।
কালেভদ্রে জয় পেলেও ধারাবাহিকতার অভাবে এখনো টেস্ট ফরম্যাটে সমীহ জাগানোর মতো দল হয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। একদিন সাদা বলের ক্রিকেটের মতো লাল বলের ক্রিকেটেও টাইগাররা বিশ্ব শাসন করবে এমন প্রত্যাশায় আছেন ক্রিকেট ভক্তরা।

আপনার মতামত লিখুন :